সারাদেশ / পাঁচ লাখে শুরু, এখন কর্মীদের মাসিক বেতনই ৮ কোটি টাকা—বিটোপিয়া গ্রুপের বিস্ময়কর উত্থান

পাঁচ লাখে শুরু, এখন কর্মীদের মাসিক বেতনই ৮ কোটি টাকা—বিটোপিয়া গ্রুপের বিস্ময়কর উত্থান

by নিউজ ফ্রন্টলাইন বিডি ডেস্ক

মাত্র পাঁচ লাখ টাকা বিনিয়োগ ও সাতজন কর্মী নিয়ে ২০১৭ সালে যাত্রা শুরু হয়েছিল একটি ছোট প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের। আট বছরের ব্যবধানে সেই প্রতিষ্ঠান এখন রূপ নিয়েছে ২২টি কোম্পানির বিশাল করপোরেট কাঠামো—বিটোপিয়া গ্রুপে। বর্তমানে গ্রুপটিতে কর্মরত প্রায় চার হাজার জনবল, আর শুধু কর্মীদের মাসিক বেতন ব্যয়ই ৮ কোটি টাকা

বিটোপিয়া গ্রুপের এই অভাবনীয় সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছেন প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) প্রকৌশলী মুহাম্মদ মনির হোসেন। শূন্য থেকে শুরু করে তিনি বিটোপিয়া গ্রুপকে দেশের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল প্রযুক্তি ও আইটি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন।

মনির হোসেনের উদ্যোক্তা জীবনের শুরু অবশ্য ২০১৩ সালে। সে সময় আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্ম ওডেস্ক ও ইল্যান্সে একা কাজ করতেন তিনি। ধীরে ধীরে কাজের চাপ ও ক্লায়েন্ট বাড়তে থাকলে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সেই পথ ধরেই প্রতিষ্ঠা হয় বিডিকলিং আইটি, যা পরবর্তীতে বিটোপিয়া গ্রুপের ভিত্তি গড়ে দেয়।

রাজধানীর মহাখালীতে বিটোপিয়া গ্রুপের কার্যালয়ে কাজ করছেন কর্মীরা। এখানে তাঁরা সফটওয়্যার, অ্যাপ তৈরি, এআই ভিত্তিক সমাধান নিয়ে কাজ করেন
ছবি: বিটোপিয়ার সৌজন্যে

প্রাথমিকভাবে ওয়েব ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট, মোবাইল অ্যাপস তৈরি, ভিজ্যুয়াল ও ক্রিয়েটিভ ডিজাইন, ডেটা এন্ট্রি এবং ডিজিটাল মার্কেটিং সেবায় কাজ করত প্রতিষ্ঠানটি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সেবার পরিধি ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে বিটোপিয়া গ্রুপের আওতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড সার্ভিস, ডেটা সেন্টার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ সরঞ্জাম, সরবরাহ শৃঙ্খল ও অবকাঠামো উন্নয়ন খাতেও বিনিয়োগ রয়েছে।

এছাড়া ফিনটেক, স্বাস্থ্যসেবা, জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তি সমাধান দিচ্ছে গ্রুপটি। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান, ব্রাজিল ও ফিলিপাইনসহ বিশ্বের ৭৮টি দেশে বিটোপিয়া গ্রুপের কার্যক্রম বিস্তৃত। এর মধ্যে ৮০–৯০ শতাংশ কাজই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক


বছরে আয় ২০০ কোটি টাকা

দুই বছর আগে, অর্থাৎ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে বিডিকলিং আইটি নিয়ে একটি প্রতিবেদনে জানা গিয়েছিল, তখন প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মী ছিল মাত্র ৪০০ জন এবং মাসিক আয় ছিল প্রায় আড়াই কোটি টাকা। কিন্তু গত দুই বছরে কর্মী সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৯০০ শতাংশ, আর আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাত গুণ

বর্তমানে বিটোপিয়া গ্রুপে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক ঋণ মাত্র ৩ কোটি টাকা, বাকি ৪২ কোটি টাকা নিজস্ব বিনিয়োগ। সর্বশেষ অর্থবছরে গ্রুপটির সম্মিলিত বার্ষিক আয় ছিল ২০০ কোটি টাকা। একই সময়ে সরকারকে রাজস্ব দিয়েছে প্রায় ২৫ লাখ টাকা

বিটোপিয়া গ্রুপের সিইও মনির হোসেন বলেন,
“আমাদের কর্মীরাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। তারা আন্তরিক, দক্ষ ও সৃজনশীল। আমি সব সময় স্বপ্ন দেখি দেশের জন্য কাজ করার, কর্মসংস্থান তৈরির। আমার কর্মীরাও সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে বিশ্বাস করে।”


এআই ও ডেটা সেন্টারে বড় বিনিয়োগ

বিটোপিয়া গ্রুপ সাম্প্রতিক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও নতুন প্রযুক্তিনির্ভর খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। দেশের প্রথম দিককার উদ্যোগ হিসেবে তারা এআই-ভিত্তিক ডেটা সেন্টার স্থাপনের কাজ শুরু করেছে, যেখানে থাকবে উচ্চক্ষমতার জিপিইউ অবকাঠামো। এতে এআই ও মেশিন লার্নিং অ্যাপ্লিকেশন পরিচালনা আরও সহজ হবে।

এআই খাতের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকা অঞ্চলে দ্রুত সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। স্থানীয় প্রতিনিধি ও অংশীদারদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে সেবা দিচ্ছে তারা। একই সঙ্গে বাংলাদেশি অন্যান্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের পণ্য বৈশ্বিক বাজারে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগও নিয়েছে বিটোপিয়া গ্রুপ।


চ্যালেঞ্জ কোথায়?

তবে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি ও এআই খাতে বেশ কিছু মৌলিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করেন মনির হোসেন। তার ভাষায়, সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথের উচ্চ খরচ ও সীমিত প্রাপ্যতা। আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় খরচ এখনো বেশি, বিশেষ করে দুই স্তরের লাইসেন্স কাঠামোর কারণে।

তিনি বলেন,
“বিদ্যুৎ সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও আমাদের কাজ থেমে যায়। তাই গ্রিন এনার্জি ও টেকসই বিদ্যুৎ ব্যবস্থার দিকে যেতে হবে। পাশাপাশি দক্ষ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, পাইথন ডেভেলপার ও হাইটেক অবকাঠামোর ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ।”

এ ছাড়া বাংলাদেশের আইটি খাতে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংয়ের ঘাটতির কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, ভারত বা ফিলিপাইনের মতো বাংলাদেশের এখনো বৈশ্বিক আইটি হাব হিসেবে পরিচিতি তৈরি হয়নি।

ফ্রিল্যান্সিং প্রসঙ্গে মনির হোসেন বলেন,
“ফ্রিল্যান্সিং ব্যক্তিগতভাবে উপকারী হলেও দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে না। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত শক্তিশালী স্থানীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যারা সরাসরি বৈশ্বিক বাজারে কাজ করবে।”

সম্পর্কিত খবর

আপনার মন্তব্য দিন

Frontline Bd

আপনার কণ্ঠস্বর, আমাদের দায়িত্ব।
We bring you fearless journalism, breaking stories, and truth from the frontlines.

ফিচার পোস্ট

বিজ্ঞাপন

মূল্য তালিকা (প্রিন্ট ভার্সন)

২০২৫-২০২৬ © Frontline BD কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত