যুক্তরাষ্ট্র আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানে সামরিক হামলা চালাতে পারে—এমন ইঙ্গিত ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। সম্ভাব্য এই হামলার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানি সেনাবাহিনী ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। তাদের ভাষায়, “যেকোনো মার্কিন হামলার দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে।”
বিবিসি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য মার্কিন লক্ষ্যবস্তুগুলো অনুমানযোগ্য হলেও এর পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা নিশ্চিত নয়। শেষ মুহূর্তে যদি তেহরানের সঙ্গে কোনো কূটনৈতিক সমঝোতা না হয় এবং সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামলার নির্দেশ দেন, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ভয়াবহ অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সম্ভাব্য দৃশ্যপট: কী ঘটতে পারে?
সার্জিক্যাল স্ট্রাইক ও ‘গণতন্ত্রে উত্তরণ’
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আইআরজিসি ঘাঁটি, বসিজ বাহিনী, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ও পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে সীমিত ও নিখুঁত (সার্জিক্যাল) হামলা চালাতে পারে।
এতে ইরানের দুর্বল শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে দেশটি গণতন্ত্রের পথে হাঁটতে পারে—এমন আশাবাদী ধারণা থাকলেও বাস্তব অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে। ইরাক ও লিবিয়ায় পশ্চিমা সামরিক হস্তক্ষেপ গণতন্ত্র নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খলা ও রক্তপাত ডেকে এনেছিল।
শাসন টিকে থাকবে, তবে নীতিতে পরিবর্তন আসবে
এটিকে অনেক বিশ্লেষক ‘ভেনেজুয়েলা মডেল’ হিসেবে দেখছেন। অর্থাৎ, শাসনব্যবস্থা টিকে থাকবে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে ইরানকে—
- মধ্যপ্রাচ্যের মিলিশিয়াদের প্রতি সমর্থন কমাতে
- পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করতে
- অভ্যন্তরীণ দমননীতি শিথিল করতে
বাধ্য হতে পারে।
তবে ৪৭ বছরের অনড় ইসলামি প্রজাতন্ত্র এই পথে হাঁটবে—এ সম্ভাবনাও তুলনামূলকভাবে কম।
শাসন ভেঙে সামরিক শাসনের আবির্ভাব
অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটিই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত আশঙ্কা। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর সৃষ্ট বিশৃঙ্খলায় আইআরজিসি-নিয়ন্ত্রিত শক্ত সামরিক সরকার ক্ষমতায় আসতে পারে।
কারণ, ইরানের ভেতরে একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা-নির্ভর ‘ডিপ স্টেট’ রয়েছে, যারা যেকোনো মূল্যে ক্ষমতা ধরে রাখতে প্রস্তুত।
যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের ওপর পাল্টা হামলা
ইরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, ‘ট্রিগারে আঙুল রাখা আছে’।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সামরিক শক্তিতে পাল্লা দিতে না পারলেও, ইরানের হাতে রয়েছে—
- বিপুল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র
- ড্রোনের বিশাল ভাণ্ডার
- গোপন ভূগর্ভস্থ সামরিক স্থাপনা
বাহরাইন, কাতারসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলার আশঙ্কা রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি: বৈশ্বিক জ্বালানির ঝুঁকি
ইরান ও ওমানের মাঝের হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বে ব্যবহৃত—
- প্রায় ২০% এলএনজি
- ২০–২৫% তেল ও তেলজাত পণ্য
পরিবাহিত হয়।
ইরান যদি এখানে সমুদ্র-মাইন পেতে দেয়, তাহলে বিশ্ববাণিজ্য ও তেলের দামে ভয়াবহ প্রভাব পড়তে পারে।
মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডোবার আশঙ্কা
ইরানি আইআরজিসি নৌবাহিনী ‘সোয়ার্ম অ্যাটাক’ কৌশলে প্রশিক্ষিত—একসঙ্গে বহু ড্রোন ও দ্রুতগামী নৌকা দিয়ে হামলা।
কোনো মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবে যাওয়া বা নাবিক বন্দী হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চরম অপমানজনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
গৃহযুদ্ধ ও মানবিক বিপর্যয়ের শঙ্কা
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, ইরানে—
- গৃহযুদ্ধ
- জাতিগত সংঘর্ষ
- শরণার্থী সংকট
সৃষ্টির সম্ভাবনা। প্রায় ৯ কোটি ৩০ লাখ জনসংখ্যার দেশটি অস্থিতিশীল হলে গোটা মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বব্যবস্থায় ভয়াবহ প্রভাব পড়বে।